না বলার কিছু কথা
দ্বাদশ শ্রেণীর শেষের দিকে। বসন্তের হালকা হাওয়ায় শিমুল তুলো উড়ছে আকাশে। স্কুলের প্রাঙ্গণে বটগাছের নীচে বসে আছে অনন্যা। সামনে বোর্ড পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে। পাশের বেঞ্চে অভীক বসে পড়াশোনা করছে। দুজনেই একই ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রী।
গত দুই বছর ধরে তারা পাশাপাশি বসে। প্রথম দিন থেকেই অনন্যার প্রতি একটা অদ্ভুত টান অনুভব করে অভীক। অনন্যার সরল হাসি, পড়াশোনায় মনোযোগ, সহপাঠীদের সাথে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা - সবকিছুই তার কাছে অসাধারণ মনে হয়।
অনন্যাও অভীকের প্রতি উদাসীন নয়। ক্লাসে যখন অভীক কোনো জটিল অঙ্কের সমাধান করে, তার বুদ্ধিমত্তা দেখে সে মুগ্ধ হয়। স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে যখন অভীক গিটার বাজায়, তখন অনন্যার হৃদয় নতুন এক তালে স্পন্দিত হয়।
কিন্তু দুজনের মধ্যেই একটা অহেতুক ভয়, একটা অযথা সংকোচ। কী বলবে, কীভাবে বলবে - এই ভাবনায় দুজনেই নীরব। টিফিনের সময় অভীক প্রায়ই অনন্যার কাছে এসে দাঁড়ায়। কিছু একটা বলতে চায়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সাহস হারিয়ে ফেলে।
একদিন লাইব্রেরিতে অনন্যা একা বসে পড়াশোনা করছিল। হঠাৎ অভীক এসে পাশের চেয়ারে বসল। দুজনের মধ্যে নীরবতা। শুধু বইয়ের পাতা ওল্টানোর শব্দ। অভীক চোখের কোণ দিয়ে দেখল, অনন্যা রবীন্দ্রনাথের 'শেষের কবিতা' পড়ছে। সে ভাবল, কী অদ্ভুত যোগাযোগ। তারও ব্যাগে সেই বইটাই রয়েছে।
"তুমিও রবীন্দ্রনাথ পড়?" - অভীক জিজ্ঞেস করল।
অনন্যা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। "হ্যাঁ। শেষের কবিতা আমার খুব প্রিয়।"
"আমারও।" - অভীক বলল।
এরপর আবার নীরবতা। কিন্তু এবার সেই নীরবতায় একটা মিষ্টি অনুভূতি। দুজনেই বুঝল, তাদের মধ্যে একটা যোগসূত্র তৈরি হয়েছে।
স্কুলের শেষ দিনগুলো এগিয়ে আসছে। বোর্ড পরীক্ষার চাপ। দুজনেই জানে, এরপর তারা হয়তো আলাদা পথে চলে যাবে। ভিন্ন কলেজ, ভিন্ন শহর। কিন্তু এখনও অনেক কথা বলা হয়নি।
একদিন স্কুলের ছাদে সূর্যাস্ত দেখছিল অনন্যা। হঠাৎ পেছন থেকে পায়ের শব্দ। অভীক।
"কী ভাবছ?" - অভীক জিজ্ঞেস করল।
"ভবিষ্যতের কথা। তুমি কোথায় পড়তে যাবে?"
"দিল্লি। আই.আই.টি-তে চেষ্টা করব। তুমি?"
"কলকাতা। প্রেসিডেন্সি।"
আবার নীরবতা। কিন্তু এবার সেই নীরবতায় একটা ব্যথা। দুজনেই জানে, এই পথ দুটো কখনও মিলবে না।
অভীক ধীরে ধীরে একটা চিঠি বের করল পকেট থেকে। "এটা তোমার জন্য।" বলে সে দ্রুত নেমে গেল ছাদ থেকে।
চিঠিতে লেখা ছিল:
"প্রিয় অনন্যা,
দুই বছর ধরে অনেক কথা বলতে চেয়েছি। কিন্তু সাহস পাইনি। আজ যখন জানি আমাদের পথ আলাদা হতে চলেছে, তখন মনে হল এই কথাগুলো না বলে গেলে হয়তো আফসোস থেকে যাবে।
তোমার হাসি, তোমার কথা বলার ভঙ্গি, তোমার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ - সবকিছু আমাকে মুগ্ধ করেছে। জানি না তুমি কী ভাবছ। হয়তো তোমার কাছে এসব হাস্যকর মনে হবে। কিন্তু আমার কাছে এই অনুভূতিগুলো খুব বাস্তব।
আমি শুধু চাই তুমি জেনে রাখ, এই দুই বছরে তুমি আমার জীবনে একটা বিশেষ জায়গা তৈরি করেছ। হয়তো আমরা আর কখনও দেখা হবে না। কিন্তু তোমার স্মৃতি আমার সঙ্গে থাকবে।
শুভেচ্ছান্তে,
অভীক"
চিঠিটা পড়ে অনন্যার চোখ ছলছল করে উঠল। সে জানালা দিয়ে দেখল, অভীক স্কুলের গেট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। তার মনে হল, সেও কত কথা বলতে চেয়েছিল। কিন্তু এখন হয়তো আর সময় নেই।
পরের দিন অভীক যখন ক্লাসে এল, তার ডেস্কে একটা চিঠি পেল। খুলে দেখল, অনন্যার লেখা। তাতে শুধু একটি লাইন:
"আমারও অনেক না-বলা কথা ছিল। হয়তো কোনোদিন বলা হবে।"
দুজনেই জানে, এই না-বলা কথাগুলোও কখনও কখনও অনেক কিছু বলে যায়। কখনও কখনও নীরবতাও একটা ভাষা হয়ে ওঠে।